Showing posts with label Abol Tabol. Show all posts
Showing posts with label Abol Tabol. Show all posts

Sunday, January 02, 2022

আবোল তাবোলের ভুতুড়ে খেলা |


সুকুমার রায়ের আবোল তাবোলের 'ভুতুড়ে খেলা' কবিতাটি প্রায় নিঃসন্দেহে ভারতীয় শিল্পকলায় বাংলা ঘরানার একটি প্রয়োগশৈলীর বিরুদ্ধে ব্যাঙ্গাত্মক ভাষ্য | কবিতাটি ১৯১৮ সালে প্রকাশিত হয়, এবং এটির অনুপ্রেরণা সম্ভবত ১৯১৭ সালে অঙ্কিত, 'আঁখি পাখি ধায়' নামক একটি চিত্র, যেটি এঁকেছিলেন খ্যাতিমান বাঙালি চিত্রশিল্পী এবং লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর | ছবিটি অবন ঠাকুর সেই বৎসর 'ভারতী' পত্রিকায় ওঁর স্বলিখিতি একটি নিবন্ধ সহকারে প্রকাশ করেন, শিল্পকলায় 'ভাব' এবং 'অন্তর্দৃষ্টি'র সমর্থনে |
'ভুতুড়ে খেলা' কবিতার অনুপ্রেরণা আসলে 'আঁখি পাখি ধায়' ছবিটি এবং নিবন্ধটি হলেও, কবিতাটিতে ব্যাঙ্গের বিশেষ লক্ষ্যবস্ত হিসাবে সুকুমার রায় নির্বাচন করেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই দশ বৎসর পূর্বের অন্য একটি সৃষ্টি – ১৯০৮ সালে জলরঙে অঙ্কিত চিত্রকর্ম – যার নাম 'গণেশ জননী' | ভুতুড়ে খেলার “পান্তভূতের জ্যান্ত ছানা” হলেন খুব সম্ভবত গণেশ, এবং কটকটে মুচকি হাসি হাস্যকারিনী ভূতের মা হলেন গণেশের জননী, পার্বতী |
কিন্তু, প্রথমে কিছু ইতিহাস: ১৯০৯ সাল নাগাদ বাংলার চিত্রশিল্পরসিক মহলে একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয় | বিষয়বস্তু ছিল পাশ্চাত্যের তুলনায় প্রাচ্যের – এক্ষেত্রে বাংলার, তথা ভারতবর্ষের – চিত্রকলার প্রয়োগশৈলীতে বাস্তবানুগ আকার-নিষ্ঠতার অভাব | বিতর্কের আধার ছিল এই প্রশ্ন, যে কোনটি যথাযথ – পাশ্চাত্যের বাস্তবানুগ আকার-নিষ্ঠতা, না প্রাচ্যের – এবং অবন ঠাকুরের প্রিয় – ভাবকেন্দ্রিক প্রতীকী প্রয়োগশৈলী | বিষয়টি এক দশকেরও বেশি বিতর্কিত হয় | 'ভারতী', 'প্রবাসী, এবং 'সাহিত্য', ইত্যাদি, পত্রপত্রিকায় এ বিষয়ে আলোচনা অবশেষে থিতিয়ে পড়ে সন ১৯২০ নাগাদ | ‘ভুতুড়ে খেলা’ কবিতার রচনাকালে এবং তার পূর্ববর্তী কয়েক বৎসরে, বিতর্কটি ছিল তুঙ্গে |
প্রাচ্যের প্রয়োগশৈলীর আধার ছিল কিছু বিধিগত নিয়মাবলী, যেগুলির শাসনে সংকীর্ণ নির্দেশের বন্ধনে অঙ্কিত হতো মানবদেহের অঙ্গসৌষ্ঠবের আকার এবং অনুপাত | অবনীন্দ্রনাথের লেখনী, 'ভারতশিল্পে মূর্তি'তে এর উদাহরণ পাওয়া যায়: যথা, পটলচেরা অথবা পদ্মপলাশ অক্ষ, কুক্কুটান্ড অথবা পান-আকৃতি মুখাবয়ব, ধনুকাকারম ললাট, নিম্বপত্রাকৃতি ভ্রুযুগ, কপাটবক্ষ, যথাক্রমে পুরুষ ও নারীর সিংহকটি অথবা কদলীকান্ডম কোমর, বালকদলীকান্ডম অগ্রবাহু, মৎসাকৃতি জংঘা, চম্পাকলির ন্যায় অঙ্গুলি, ইত্যাদি | উপরন্ত, নর, ক্রুর, অসুর, বাল এবং কুমার নামক বিভিন্ন 'শ্রেণী'র 'মূর্তি'র অঙ্কনের জন্য ছিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আয়তনের অনুপাতের বিধিবদ্ধ ব্যাকরণ | একারণে, তৎকালীন বঙ্গীয় চিত্রকলায় কিছু অবাস্তব ধরণের মানবমূর্তি অঙ্কিত হয় – অদ্ভুত ধরণের চোখ, অতিপ্রশস্থ অথবা অতিক্ষীণ কটিদেশ এবং অস্বাভাবিক রকমের অতিলম্বিত বাহু সম্বলিত |
বিতর্কটি সমন্ধে ইংল্যান্ডের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Sussex) অধ্যাপক, পার্থ মিত্র মহাশয় তাঁর ইংরাজিতে লিখিত আর্ট এন্ড ন্যাশনালিস্ম ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া ১৮৫০-১৯২২ অকসিডেন্টাল ওরিয়েন্টেসন্স (Art and Nationalism in Colonial India 1850-1922 Occidental Orientations (Cambridge University Press, 1994)) বইটিতে সবিশেষ আলোচনা করেছেন | এই প্রসঙ্গে, অবনীন্দ্রনাথের 'বুদ্ধ এবং সুজাতা' নামক জলরঙ চিত্র সম্বন্ধে তৎকালীন 'সাহিত্য' পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নিবন্ধ – যেটি আসলে ছিল দীনেশ সেন মহাশয় কর্তৃক চিত্রটির জ্ঞানগম্ভীর সমালোচনার ব্যাঙ্গসূচক নকলরূপে উপহাস – থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে পার্থ মিত্র মহাশয় উপহাসটির বক্তব্য সম্বন্ধে ইংরাজিতে লেখেন, "পাঠকগণ নিবন্ধটি পড়িয়া আমোদিত হইয়াছিলেন, কারণ তাঁহারা অনুধাবন করিতে পারিয়াছিলেন যে [ব্যাঙ্গাত্মক নকল সমালোচনায়] সুজাতার [শীর্ণ বৃক্ষশাখার ন্যায়] অতিলম্বিত বাহুদ্বয়ের বর্ণনা বঙ্গীয় উপকথার পেত্নী অথবা শাঁকচুন্নির প্রতিই ইঙ্গিত করিতেছে (The passage amused the readers, for they recognized Sujata’s unnaturally long arms as referring to the arms of hideous female vampires of Bengali folktales.) |"[১]


'ভারতী', 'প্রবাসী, 'সাহিত্য', ইত্যাদি, সমসাময়িক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত আলোচনা, সমালোচনা, নিবন্ধ এবং চিঠিপত্র হতে জানা যায় যে সুকুমার রায় ছিলেন শিল্পকলায় বাস্তবানুগ আকার-নিষ্ঠতার অনুরাগী | অন্যদিকে, খ্যাতনামা শিল্প-সমালোচক অর্ধেন্দু কুমার গাঙ্গুলী মহাশয় ছিলেন অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতীয় চিত্রকলা পদ্ধতি'র সমর্থক | একসময় সুকুমার রায় গাঙ্গুলী মহাশয়কে বিদ্রুপ করে লেখেন যে অর্ধেন্দু বাবুর যুক্তি থেকে সুকুমার রায় বোধ করেন যে ভারতীয় চিত্রকলা পদ্ধতিতে আকার-নিষ্ঠার কোনো অবকাশই নেই; বাস্তব বস্তুর আকার এবং বর্ণ শিল্পীর উপেক্ষার বস্তু; শিল্পী চিত্রের ভাব সম্বন্ধে ধ্যান করেন এবং তাঁর অন্তর্দৃষ্টিতে যা উদয় হয়, তাই আঁকেন – চর্মচক্ষে যা দেখা যায় তা ভ্রম মাত্র |[২]
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন শিল্পকলায় 'ভাব' এর প্রবর্তক | সুকুমার রায়, অন্যদিকে, মনে করতেন যে রূপককে আক্ষরিক অর্থে ব্যক্ত করাটা হাস্যকর রকমের অযৌক্তিক |[৩] অবন ঠাকুরের দাবি ছিল যে তাঁর চিত্রকলা তাঁর 'অন্তর্দৃষ্টির' আজ্ঞাবহ | ১৯১৭ সালে 'ভারতী' পত্রিকায় 'আঁখি পাখি ধায়' নামক চিত্রটির মাধ্যমে তিনি এই অন্তর্দৃষ্টির ধারণাটিই চিত্রায়নের প্রচেষ্টা করেন | 'আঁখি পাখি ধায়' ছিল এমনি একটি ছবি যাতে কোনো পাখিই দৃশ্যমান ছিল না, বরং ছিল কামরার অভ্যন্তর হতে গবাক্ষ পথে বহিঃজগতে দৃষ্টিপাতকারিনী একটি বালিকা | অবনীন্দ্রনাথের দাবি ছিল যে ছবির বালিকাটি পিঞ্জরের পক্ষীর প্রতীক, যদিও ছবিতে কোনো পাখি নেই, কারণ চিত্রটির ভাবনায় অবনীন্দ্রনাথের অন্তর্দৃষ্টিতে পক্ষী বিরাজমান ছিল – যদিও চিত্র-অবলোকনকারীর পক্ষে তার 'উপস্থিতি' ছিল নিতান্তই মানসচক্ষে |


উপরোক্ত অবন-দর্শন অতি 'ভাব'গম্ভীর হলেও, দৃষ্টশিপ্লের পরিপ্রেক্ষিতে ছিল হাস্যাস্পদ | এর উত্তরে ওঁরই প্রাক্তন ছাত্র, ব্যাঙ্গচিত্রকার যতীন সেন আঁকেন 'দ্য কুইন কনটেমপ্লেটিং দ্য বার্ড (The Queen Contemplating the Bird)’ – যার বাংলা তর্জমা, 'রাজমহিষীর পক্ষী অবলোকন' | ব্যাঙ্গচিত্রটির বিষয়বস্তু ছিল হস্তধৃত খাঁচায় পাখি সমেত এক রাজরানী, যাঁর চোখের দৃষ্টি ছিল পিঞ্জরের পক্ষীর সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে | বক্তব্য এই, যে রাজমহিষী পক্ষী অবলোকন করিতেছেন, তবে অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা |[৪]


সুকুমার রায়ের "ভুতুড়ে খেলা" কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় সন্দেশ পত্রিকার ১৯১৮ সালের এপ্রিল-মে সংখ্যায় | রচনাকাল সম্ভবত ১৯১৮ সালের একেবারে গোড়ায়, নয়তো ১৯১৭ সালের শেষের দিকে | কালক্রমের হিসাব অনুযায়ী এবং বিষয়বস্তু সম্বন্ধে সুকুমার রায়ের মনোভাবের পরিপ্রেক্ষিতে কবিতাটির তাই ১৯১৭ সালের 'আঁখি পাখি ধায়' চিত্রটির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে থেকে থাকার সম্ভাবনা প্রবল |
এই বিশ্লেষণে আগেই বলা হয়েছে যে 'ভুতুড়ে খেলা' কবিতার অনুপ্রেরণা আসলে 'আঁখি পাখি ধায়' চিত্রটি হলেও, কবিতাটিতে ব্যাঙ্গের বিশেষ লক্ষ্যবস্ত হিসাবে সুকুমার রায় নির্বাচন করেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই অন্য একটি চিত্রকর্ম – যার নাম 'গণেশ জননী' | ‘গণেশ জননী’ চিত্রটিতেও অবনীন্দ্রনাথ তাঁর 'ভারতীয় চিত্রকলা পদ্ধতি'র প্রয়োগ করেছিলেন | 'সাহিত্য' পত্রিকা এই ছবিটি সম্বন্ধে মন্তব্য করেন যে তাঁরা হাতিশুঁড়ো গণেশ ঠাকুর সম্বন্ধে তেমন চিন্তিত নন, বরং সেই সব শিল্পীদের সম্বন্ধে উদ্বিগ্ন, যাঁরা তাঁদের জলরঙের তুলি আপন শুঁড়ে ধারণ করে থাকেন |[৫]


'ভুতুড়ে খেলা' কবিতাটিতে যে একাধারে (১) অবনীন্দ্রনাথের ‘ভারতীয় চিত্রকলা পদ্ধতি’র বিরুদ্ধে ব্যাঙ্গাত্মক ভাষ্য বর্তমান, (২) কবিতাটির অনুপ্রেরণা যে অবনীন্দ্রনাথের 'আঁখি পাখি ধায়' ও তার আনুষাঙ্গিক 'অন্তর্দৃষ্টি' সম্বন্ধিত নিবন্ধ এবং (৩) কবিতাটির লক্ষ্যবস্তু যে 'গণেশ জননী' চিত্রটি, তা আবিষ্কার করতে বিশেষ বেগ পেতে হয় না |
প্রথমত, অবনীন্দ্রনাথের 'অন্তর্দৃষ্টি'কে ব্যঙ্গ করে সুকুমার রায় লেখেন যে তিনি "পষ্ট চোখে [দেখছেন] বিনা চশমাতে" – অর্থাৎ, ওঁর দর্শন চর্মচক্ষের দর্শন, অন্তর্দৃষ্টির চশমার সাহায্য বিনা |
দ্বিতীয়ত, চর্মচক্ষে দৃশ্য 'গণেশ জননী' ছবিটির গণেশ এবং গণেশের মা পার্বতীকে "পান্তভূতের জ্যান্ত ছানা" এবং "ভূতের মা" তে রূপান্তরকরণ খুব সম্ভবত 'সাহিত্য' পত্রিকায় অবনীন্দ্রনাথের 'বুদ্ধ এবং সুজাতা' ছবিটির সুজাতার পেত্নীর মতো হাতের ব্যঙ্গ দ্বারা অনুপ্রাণিত | অবন ঠাকুরের ছবিটির ঈশান কোনে, আকাশে এক ফালি চন্দ্রকলাও পরিলক্ষন করা যায় – তাই "করছে খেলা জোছনাতে" পংক্তিটিও সম্ভবত 'গণেশ জননী' ছবিটির দিকেই ইঙ্গিত করে | ছবিটিতে গণেশ যে ক্রীড়ারত, তা সহজেই বোধগম্য |
তৃতীয়ত, প্রায় সমগ্র কবিতাটি জুড়েই – ভূতের ছানার প্রতি ভূতের মায়ের আদরের সম্বোধনগুলি – যথা, "আদর–গেলা কোঁত্‌কা", "ওরে আমার হোঁত্‌কা", "ময়দাঠাসা নাদুস্‌", ইত্যাদি, স্পষ্টতই ইঙ্গিত করে যে ছানাটি ছিল গোলগাল, হৃষ্টপুষ্ট | বঙ্গদেশের ভূতের বর্ণনায় 'হৃষ্টপুষ্ট' বিশেষণটির ব্যবহার বিরল – তার উল্টোটিই বরং সার্বজনীন ভাবে সত্য | কিন্তু, কবিতার ভূতের ছানা যদি ছবির গণেশের প্রতীক হয়ে থেকে থাকে, এ কথা অনস্বীকার্য যে 'হৃষ্টপুষ্ট' বিশেষণটি গণেশের যথোপযুক্ত বটে | অবশ্য সুকুমার রায় ভূতের মাকে দিয়ে ভূতের ছানাকে সটান "গোবরা গণেশ"ও বলিয়েছেন – তবে গণেশের সনাক্তকরণে এটি অমীমাংসাকারী, কারণ বাগ্ধারাগত ব্যবহারে 'গোবরা গণেশ' গণেশ ঠাকুর না বুঝিয়ে, হৃষ্টপুষ্টই বোঝায় | তবে, এখানে সুকুমার রায় দ্বর্থবোধকভাবে ছবির গণেশটিকে নিকৃষ্ট মানের – বা 'গোবরা' গণেশও হয়তো বলে থেকে থাকবেন |
আরো দ্রষ্টব্য যে কবিতার প্রথম পংক্তিতে 'অন্তর্দৃষ্টি'কে ব্যঙ্গ করে সুকুমার রায় লিখেছেন যে ভুতুড়ে খেলার দৃশ্যটি তিনি অন্তর্দৃষ্টির বদলে চর্মচক্ষেই অবলোকন করেছেন | আগে, অর্ধেন্দু কুমার গাঙ্গুলী মহাশয়ের বিরুদ্ধে মন্তব্যে সুকুমার রায় বলেছিলেন যে গাঙ্গুলী মহাশয়ের যুক্তি অনুসারে সুকুমার রায় মনে করেন যে চর্মচক্ষে যা দেখা যায় তা 'ভ্রম মাত্র' | কবিতার শেষ পংক্তিতে, তারই জের টেনে, সুকুমার রায় দাবি করেছেন যে যেহেতু দৃশ্যটি তিনি চর্মচক্ষে অবলোকন করেছেন, সেহেতু দৃশ্যটি নিশ্চয়ই ছিল ভ্রম মাত্র – "ভূতের ফাঁকি", যা নিমেষেই অন্তর্ধিত হয়েছিল - "মিলিয়ে গেল চট্‌ ক’রে !"
যদিও বিশ্লেষণের গোড়াতেই বলা হয়েছে যে কবিতাটি 'প্রায় নিঃসন্দেহে' ভারতীয় শিল্পকলায় বিরুদ্ধে ভাষ্য, নিঃসন্দেহ হতে হলে যে ধরণের অকাট্য প্রমান প্রয়োজন হয়, দুর্ভাগ্যক্রমে, তার অভাব | অতএব, উপরের ব্যাখ্যাটি যথাযথ বলে স্বীকার বা অস্বীকারের অধিকার অবশ্যই সমূর্ণভাবে পাঠকের |
প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে অন্য অন্তত একটি বিশ্লেষণের মতে, কবিতার ভুতুড়ে জুড়িকে বাংলার মন্বন্তর-পীড়িত কৃশকায় সাধারণ মানুষের প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে |[৬] বাংলার দুই মহা-মন্বন্তরের কোনটিরই তারিখ 'ভুতুড়ে খেলা' কবিতাটির কালক্রমের ধারে-কাছেও অবস্থিত নয় | উপরন্ত, মন্বন্তরের বিষয়টিকে ভিত্তি করে হাস্যরসাত্মক ব্যাঙ্গাত্মক কবিতা রচনা, সুকুমার রায়ের চরিত্রের যতটুকু জানা যায়, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য বহন করে না |
সতর্কীকরণ: শখের সুকুমার-বিশ্লেষকদের দল থেকে মাঝে মাঝেই একটি ব্যাখ্যার উপস্থাপনা করা হয়ে থাকে যে 'ভুতুড়ে খেলা' কবিতার "ছিঁচকাঁদুনে ফোক্‌লা মানিক" বাক্যাংশটি নাকি সুকুমার রায়ের শিশুপুত্র সত্যজিৎ – যার ডাক নাম ছিল মানিক – তার উদ্দেশ্যে লেখা | এই চাঞ্চল্যকর 'তথ্যটি' একান্তই ভ্রান্ত | 'ভুতুড়ে খেলা' কবিতাটি রচিত হয় ১৯১৭-১৮ সালে | সত্যজিৎ, ওরেফে মানিকের জন্ম ১৯২১ |
পরিশেষে, উল্লেখযোগ্য যে মতের এতো অমিলের মধ্যেও, সুকুমার রায় কিন্তু ‘ভারতীয় চিত্রকলা পদ্ধতি’র উপর রচিত 'মূর্তি' নামক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এককগ্রন্থটি ইংরাজিতে অনুবাদ করেছিলেন, 'ইন্ডিয়ান আইকোনোগ্রাফি (Indian Iconography)’ শীর্ষক দিয়ে |
- উৎস: 'আলোয় ঢাকা অন্ধকার' - নীলাদ্রি রায়, দে'জ পাবলিশিং |
==========
• ১) Mitter, Partha. Art and Nationalism in Colonial India 1850-1922 Occidental Orientations, Cambridge University Press, 1994, 360-361
• ২) ঐ, 368
• ৩) ঐ, 368
• ৪) ঐ, 371
• ৫) ঐ, 361
• ৬) Maiti, Abhik. The Nonsense World of Sukumar Roy [sic]: The Influence of British Colonialism on Sukumar Roy’s [sic] Nonsense Poems – With Special Reference to Abol Tabol, International Journal of English Language, Literature and Translation Studies (IJELR), Vol. 3. Issue 2, 2016, 446

 আবোল তাবোলের 'হাতুড়ে' কবিতা


 |

'হাতুড়ে' কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় সন্দেশ পত্রিকার ১৯১৬ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর সংখ্যায় |
‘হাতুড়ে’ শব্দটি বাংলা ভাষায় কবে সমন্বিত হয় তা জানা যায় নি | শব্দটির বাগধারাগত অর্থ এমন সব ব্যক্তি যারা চিকিৎসাশাস্ত্রে জ্ঞান ও দক্ষতার দাবি করে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রোগ নির্ণয়ে এবং নিরাময়ে অপটু অথবা অপারগ | শব্দটির উৎপত্তি রোগের উৎস সন্ধানে 'হাতড়ে' বেড়ানো থেকে, নাকি বারংবার হাতুড়ি ঠুকে কোনো যন্ত্র বা কলকব্জার গলদের উৎসসন্ধান (অথবা হাতুড়ির অন্ধ-ঘায়ে গলদ শোধরানোর আশা) থেকে, তা নিশ্চিতভাবে বলা দুস্কর |
কবিতাটি খুব সম্ভবত ভারতবর্ষে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের (Indian Civil Service) নবীন ব্রিটিশ আধিকারিকদের লক্ষ্য করে রচিত ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক ভাষ্য | সেই সময়ে, বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে এক সঙ্কটকাল উপনীত হয় – যে প্রসঙ্গ অনতিবিলম্বেই আলোচ্য |
কবিতার প্রথম প্রকাশনাকাল বিবেচনা করলে, 'হাতুড়ে' কবিতাটি সম্ভবত ১৯১৬ সালের গোড়ার দিকে রচিত | অর্থাৎ, কবিতাটি আবোল তাবোলের প্রথম-বিশ্বযুদ্ধকালীন-রচিত কবিতাসমষ্টির অন্তর্গত | স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে ১৯১৬ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে, হঠাৎ ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস সমন্ধে কবিতা কেন রচনা করবেন সুকুমার রায়? আবোল তাবোলের অন্যান্য অনেক কবিতায় দেখা গেছে যে নেহাত সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে ভাষ্য না হলে, সুকুমার রায়ের কবিতার ব্যঙ্গ বা ভাষ্যের লক্ষ্য ছিল সমসাময়িক কোনো ব্যক্তি বা ঘটনা | অর্থাৎ, কবিতার বিষয় নির্বাচনের একটি সমসাময়িক প্রেরণা, প্ররোচনা বা কারণ ছিল | ১৯১৬ সালে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস সমন্ধে কবিতা রচনার কোনো বিশেষ কারণ ছিল কি? ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের ইতিহাস খতিয়ে দেখলে জানা যায় যে ছিল |
সেই সময়ে, বস্তুতঃ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুর সময় থেকেই, ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে অভিজ্ঞ আধিকারিকের অভাব প্রকট হতে শুরু করে | এর অন্যতম কারণ অবশ্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধই | ১৯১৪ সালের ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৪৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রথমে ১১ জন এবং তারপরে আরো ৩ জন, সরকারি চাকরির বদলে বেছে নেন দেশের প্রতি তাঁদের সামরিক দায়িত্ব | সেই কারণে সে বছরের নতুন আধিকারিকদের সংখ্যা এক ধাক্কায় ত্রিশ শতাংশ হ্রাসপ্রাপ্ত হয় | ১৯১৫ সাল নাগাদ এর প্রভাব ভারতবর্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যার তুলনায় সিভিল সার্ভিস আধিকারিকের অভাব রূপে অনুভূত হতে শুরু করে | প্রাককলিত হিসাবে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির সময় ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের আধিকারিকবল ছিল প্রয়োজনের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কম | দক্ষ আধিকারিকের অভাবে অনভিজ্ঞ নবীন আধিকারিকদের উপর ১৯১৫ সাল থেকেই ন্যস্ত হতে শুরু হয় ক্রমবর্ধমান দায়িত্ব, এবং তা রীতিমত সঙ্গীন অবস্থায় পৌঁছায় ১৯১৬ সালে | সেকালের সংবাদমাধ্যমে এই বিষয় সমন্ধে আলোচনা হয়েছিল কিনা সে সংবাদ অনুসন্ধান করে ওঠা সম্ভব হয় নি, তবে আলোচনা হয়ে থাকাটাই স্বাভাবিক |
স্বভাবতই, নবীন আধিকারিকবর্গ ছিলেন শাসন কার্য্যে অনভিজ্ঞ | 'হাতুড়ে' আখ্যান খুব সম্ভবত শাসন কার্য্যে তাঁদের হাতুড়ে ডাক্তার সুলভ অপটুতা অথবা অপারগতাকে ব্যঙ্গ করেই | অভিজ্ঞতার অভাবে নবীনেরা প্রায়শই পুরাতন নথিপত্র অবলম্বনে পূর্ববর্তী নজির বা দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নিতেন | পূর্ববর্তী নজির বা দৃষ্টান্ত সমসাময়িক বিচার্য্য বিষয়ের সঙ্গে কতটা প্রাসঙ্গিক সে সমন্ধে বিশেষ মাথাব্যথা, বা হয়তো সময়ও, তাঁদের ছিলনা | এ সমন্ধে শশী থারুর মহাশয় তাঁর ২০১৬ সালে প্রকাশিত 'দি আন-ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস' (The Un-Indian Civil Service; Open magazine, August 12, 2016) শিরোনামের প্রবন্ধে ইংরাজিতে লেখেন: "ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের প্রণালী ছিল যে কোনো মাপকাঠির বিচারেই চমকপ্রদ | চব্বিশ বৎসর বর্ষীয় নবীন জেলা-আধিকারিক আবিষ্কার করতেন যে তাঁর অধীনে ৪০০০ বর্গমাইল এলাকা এবং দশ লক্ষ জনতা | স্বভাবতই তাঁরা হয়ে পড়তেন 'পূর্ববর্তী পরোয়ানার' স্বৈরশাসনের শিকার |”
প্রবন্ধের সমর্থনে শশী থারুর হ্যারল্ড ফিল্ডিঙ-হল মহাশয়ের (যিনি স্বয়ং ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে ত্রিশ বৎসর আধিকারিক পদে নিয়োজিত ছিলেন) 'দ্য পাসিং অফ এম্পায়ার' (The Passing of Empire; Hurst & Blackett, Ltd., London 1913) নামক ১৯১৩ সালে প্রকাশিত ইংরাজিতে লেখা পুস্তক থেকে উধৃতি দেন: "শাসনাধীন জনসাধারণের প্রতি সরকারের মনোভাব সম্পূর্ণভাবে কলুষিত | [স্থানীয় পরিস্থিতির] জ্ঞান আর অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ বিচারবুদ্ধির অভাব দৃশ্যমান | পরিবর্তে আছে বর্তমান পরিস্থিতির ভ্রান্ত পরিমাপের, অথবা বর্তমান পরিস্থিতিতে অপ্রাসঙ্গিক পুরাতন পরিস্থিতির দৃষ্টিকোণের ভিত্তিতে কিছু বদ্ধমূল চিন্তাধারা – যেগুলির সংশোধন কোনোদিনই আর হয়ে ওঠেনা | নবীন আধিকারিকেরা পুরাতন কাগজপত্র থেকে জ্ঞানার্জনের অপচেষ্টা করেন, এবং সেগুলিতে নথিবদ্ধ সিদ্ধান্তগুলির ভুলভ্রান্তির পুনরাবৃত্তি করে থাকেন | নিজেদের সিদ্ধান্তের সমর্থনে তাঁরা 'পূর্ববর্তী নজির অবলম্বনে' কাজ করছেন |"
১৯১৩ সালের এই অবস্থা যে ১৯১৬ সালের আধিকারিকবল-সঙ্কটের সময় আরো বর্ধিত আকারে অনুভূত হয়েছিল তার অনুধাবন বিশেষ কল্পনাশক্তির অপেক্ষা রাখেনা |
ফিল্ডিঙ-হল বর্ণিত 'পুরাতন কাগজপত্র' অবলম্বনে আধিকারিকদের কাজের পদ্ধতি কবিতায় অতি সহজেই "কাগজের রোগী কেটে আগে কর মক্‌স" হয়ে উঠতে বিশেষ বাধা নেই | ফিল্ডিঙ-হল বর্ণিত বর্তমান পরিস্থিতিতে অপ্রাসঙ্গিক বদ্ধমূল চিন্তাধারার প্রসঙ্গটিও "মোর কাছে ভেদ নাই, কলেরা কি ডেঙ্গু" পংক্তিটির বক্তব্য থেকে বিশেষ দূর বলা চলে না | উপরন্ত, আগেও লক্ষ্য করা গেছে যে সুকুমার রায়ের জ্ঞানানুরাগ এবং পড়াশোনা ছিল সুদূরপ্রসারী | ১৯১৩ সালে প্রকাশিত ফিল্ডিঙ-হল মহাশয়ের বইটি সুকুমার রায় স্বয়ং পড়ে থেকে থাকবেন এ সম্ভাবনাও একেবারে অগ্রাহ্য করা চলে না |
অবশ্য, অন্যান্য কবিতার বিশ্লেষণগুলির মতোই, এই ব্যাখ্যাটি বিশ্লেষকের অভিমত মাত্র | বিকল্প, এবং হয়তো অধিকতর গ্রহণযোগ্য, ব্যাখ্যা থাকতেই পারে | উপরের ব্যাখ্যাটিই যে যথাযথ, এমন কোনো দাবি নেই |
টীকা:
(১). ১৮৬০ সাল থেকেই অবশ্য ভারতীয়রাও ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরিক্ষায় বসতে শুরু করেছিলেন | তবে ১৯১৬ সালেও আধিকারিকদের অত্যধিকাংশ ছিলেন ইংরাজ |
(২). শশী থারুর মহাশয় তাঁর প্রবন্ধে মূল ইংরাজিতে 'পূর্ববর্তী পরোয়ানার' স্বৈরশাসনের সমন্ধে লিখেছিলেন tyranny of the Warrant of Precedence | বক্তব্য যথাযত হলেও Warrant of Precedence এর ব্যবহারটি ভ্রান্ত | Warrant of Precedence পূর্ববর্তী পরোয়ানা নামক এক 'ধারণা' নয় | চলিত ভাষায় Blue Book নামে পরিচিত, Warrant of Precedence বাস্তবে ছিল ক্ষুদ্র আকারের একটি পুস্তিকা, যেটি ব্যবহার করতেন, প্রধানত, ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের আধিকারিকেরাই | পুস্তিকাটি ছিল স্বয়ং বড়লাট থেকে শুরু করে সর্বকনিষ্ঠ আধিকারিক পর্যন্ত পদমর্যাদার পূর্ববর্তীতার তালিকা | জানা যায় যে রাজকীয় সভায় অথবা ভোজের মেজে কে কোথায় বসবেন তা নির্ণয় করতে পুস্তিকাটি ছিল অপরিহার্য্য |
উৎস: 'আলোয় ঢাকা অন্ধকার' - নীলাদ্রি রায়, দে'জ পাবলিশিং ||

Monday, July 17, 2017

কাঠ-কাহিনী



কাঠ-কাহিনী

নীলাদ্রি রায়

(এর আগের ঘটনা জানা না থাকলে পড়ুন গানের গুঁতো রহস্যে ফেলুদা|)

"শীততাপ-নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রটা কার আবিষ্কার মশাই?" এয়ারকন্ডিশনার এর ঠাণ্ডা হাওয়ার সামনে ভারী তৃপ্তি করে বসতে বসতে জিজ্ঞাসা করলেন লালমোহনবাবু | "লোকটার নোবেল প্রাইজ পাওয়া উচিত |"

লালমোহনবাবুর আমন্ত্রণে রবিবার সকালের আড্ডাটা আজ ওনার বাড়িতেই | সপ্তাহ দুয়েক হলো জটায়ুর লেটেস্ট উপন্যাস, অস্ট্রেলিয়ায় অষ্টরম্ভা, বেরিয়ে পড়েছে | লালমোহনবাবু অস্ট্রেলিয়া গিয়ে, সরজমিনে গোট আইল্যান্ডটা তদারক করে এসে, সেই লোকেশনকে ভিত্তি করে লিখেছেন, তাই পাঠকেরা প্রখর রুদ্রর প্রবল পরাক্রম ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া সম্বন্ধে নানান খুঁটিনাটি তথ্য জানতে পারছে | বইয়ের অভ্যর্থনা তাই অন্যান্যবারের চাইতেও ভালো | প্রথম চারদিনেই নাকি ছ-হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল| প্রকাশকের খবরে, এখনো চাহিদায় মন্দার লক্ষণের লেশমাত্র নেই |

বই বিক্রির হিসেবে পুলকিত হয়ে লালমোহনবাবু বসার ঘরে আর শোবার ঘরে একখানা করে রুম এয়ারকন্ডিশনার লাগিয়ে ফেলেছেন | এর পেছনে একটা ছোট্ট ইতিহাসও আছে অবশ্য | গত জানুয়ারী মাসে অস্ট্রেলিয়া যাবার সময় ফেলুদার সাবধানবাণী বেমালুম ভুলে মেরে দিয়ে ভদ্রলোক ফ্ল্যানেলের গরম জামা-গেঞ্জি ভর্তি সুটকেস গুছিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন | অস্ট্রেলিয়া পৌঁছে গরমে নাজেহাল হয়ে খেয়াল হয় যে দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত হওয়ার দরুন ওখানে তখন গ্রীষ্মকাল | লালমোহনবাবু বলেছেন যে পিঠোপিঠি দু-দুটো গ্রীষ্মকাল ওনার ধাতে সইবেনা - তাই এসির ব্যবস্থা | তা, ব্যাপারটা বেশ সময়োপযোগী হয়েছে | কলকাতায় বেজায় গরম পড়েছে এবার | তাই এয়ারকন্ডিশনার এর হাওয়াটা মন্দ লাগছেনা |

লালমোহনবাবুর প্রশ্নটা শুনে ফেলুদা একটা একপেশে হাসি হাসলো | বললো, "প্রথমেই বলে রাখি, লালমোহনবাবু, জলীয় পদার্থ বাস্পে পরিণত হলে পার্শ্ববর্তী জায়গা যে ঠান্ডা হয়, সেটা ফারাওদের সময়কার প্রাচীন মিশরেও জানা ছিল | তবে আপনি যে ধরণের এয়ারকন্ডিশনার এর কথা বলছেন, সেটা সফল বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আবিষ্কার হয় ১৯০২ সালে | আবিষ্কারক উইলিস ক্যারিয়ার নামে আমেরিকার নিউ ইয়র্ক স্টেট্ এর বাফেলো শহরের এক ইঞ্জিনিয়ার | ক্যারিয়ার এয়ারকন নামটা শুনে থাকবেন | ওই উইলিয়াম ক্যারিয়ার এর নামেই কোম্পানির নাম |"

"বাঃ, বাঃ, নতুন জিনিস জানা গেলো, মশাই!"

"তবে এয়ারকন্ডিশনার এর বাংলা নামটা বলতে আপনার একটু ভুল হয়ে গিয়েছে কিন্তু - বাংলা কথাটা শীততাপ নয়, শীতাতপ - শীত যুক্ত আতপ | ঠাণ্ডা-গরমের নিয়ন্ত্রণ থেকেই শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ এর উৎপত্তি |"

"ঈশ! ভাগ্যিস বইতে বরাবর এয়ারকন্ডিশনারই লিখে এসিচি!”, জিভ কেটে বললেন লালমোহনবাবু | "আপনার কাছে বিদ্যে ফলাতে গিয়ে আজ খামোকা বিপাকে পড়লুম | আর ভুল হবেনা ! জয় বাবা ক্যারিয়ার সাহেব ! যাক, তাহলে ক্যারিয়ারএর ক্যারিশমাতেই আজ এই বেজায় গরমেও আপনাদের ইনভাইট করে ঠাণ্ডা হাওয়া খাওয়াতে পারছি !"

"তা পারছেন," সামনের প্লেটে রাখা একটা গরম শিঙাড়া তুলে নিয়ে কামড় দিয়ে বললো ফেলুদা | "তবে সাথে গরম চা-জলখাবারও যখন রয়েছে, তখন কেবল ঠাণ্ডা হাওয়া খাওয়ানো যে আপনার উদেশ্য নয় সেতো বুঝতে পারছি |"

"হেঁ-হেঁ, ধরেছেন ঠিক!" লালমোহনবাবু চার আনা লজ্জিত আর বারো আনা বিগলিত হলেন | "আসলে হয়েছে কি, ওই গানের গুঁতো কবিতাটার মানের রহস্যোদঘাটনের সময় জেনেছিলুম যে আরো অনেক কবিতার মানে ধরে ফেলায় আপনি বিশেষ কেরামতি দেখিয়েছেন, কিন্তু গল্পগুলো আর জানা হয় নি| তাই ভাবছিলুম, এখন তো আপনার হাতে কেস টেস নেই, যদি এক-আধখানা ব্যাখ্যা করে বলেন |”

"কোনটার প্রতি আপনার বিশেষ পক্ষপাত, লালমোহনবাবু?" জানতে চাইলো ফেলুদা |

ইয়ে, তপেশরঞ্জন বলেছিলো, আমার মনে আছে, যে কাঠ বুড়ো কবিতাটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জন্য ভারতবর্ষে সৈনিক সংগ্রহের ওপরে লেখা | শুনে অব্দি কৌতূহলটা পেটের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে | ঐটে কেমন করে হলো সেটা বলবেন কি?"

"বলতে আর বাধা কোথায়?" শিঙাড়াটা শেষ করে চায়ের পেয়ালাটা তুলে নিতে নিতে বললো ফেলুদা, "তবে ঘটনাটা ইন্টারেস্টিং হলেও এমডেন-সিডনীর নৌযুদ্ধের মতো রোমহর্ষক নয় কিন্তু! তাছাড়া, গানের গুঁতোর মতো রহস্য-গল্পের স্বাদ এতে পাবেন কিনা সন্দেহ | বরং ব্যাপারটা রহস্য ছাড়াই যেন রহস্য-গল্পের শেষ পরিচ্ছেদে গোয়েন্দার রহস্য উন্মোচনের মতো মনে হবে| আবহ সংগীত-টঙ্গীত টপকে একেবারে সোজা ক্লাইম্যাক্স | তাতে কিন্তু তেমন ভালো গল্প হয় না!"

"সে না হোক! আপনি বলুন", আবদার করলেন লালমোহনবাবু, "জিনিসটা তো জানা যাবে! ছোটবেলায় এথেনিয়াম ইনস্টিটিউশনের বাংলার মাস্টারমশাই বৈকুণ্ঠনাথ মল্লিক কবিতায় লিখেছিলেন:

এই: মন কত অজানারে নাহি জানে, তাই: রাখি চক্ষু-কর্ণ খোলা চারি পানে | সদা: কান পাতি' শুনি, ইতি-উতি চাই, যদি: অমূল্য রতন মেলে উড়াইয়া ছাই |

'এই’, ‘তাই’, ‘সদা' আর যদি'-র ব্যবহারটা লক্ষ্য করেছেন? ইউনিক!"

আমার অবশ্য চারি পানে চক্ষু-কর্ণ খোলা রাখা আর ইতি-উতি টা মোটেই কাব্যিক বলে মনে হলো না | তবে লালমোহনবাবু আবার যদি বৈকুণ্ঠ মল্লিক চুঁচুড়ার লোক হবার দোহাই দেন, সেই মনে করে চেপে গেলাম | ফেলুদা পরে বলেছিলো যে লালমোহনবাবু যেটাকে ইউনিক বললেন সেটা মোটেই ইউনিক নয় - প্রাচীন গ্রীক দের সময় থেকেই নাকি চালু আছে | গ্রীক 'এনাফোরা' আর 'এপিফোরা' নামক কাব্যিক কারসাজির মিশ্রণ | তবে ভদ্রলোক ইতি-উতির বদলে ‘কান পাতি' র সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে 'চোখ মেলি' লিখলেই বোধহয় ভালো করতেন |

বৈকুন্ঠ মল্লিকের ওপরে তো আর কথা চলেনা |”, পাক্কা অভিনেতার কায়দায় ভাবলেশহীন মুখ করে বললো ফেলুদা | “শুনুন তাহলে | আবোল তাবোলের যে কোনো কবিতার মানে বুঝতে হলে প্রথমেই শুরু করতে হয় কবিতাটির প্রথম প্রকাশনার তারিখ থেকে |”

সেটা কেন, ফেলুবাবু?”

আবোল তাবোলের বেশির ভাগ কবিতাতেই সুকুমার রায় যে ব্যঙ্গ বা টিপ্পনি করে গেছেন তা কবিতা লেখার সমসাময়িক কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে”, চায়ের পেয়ালায় একটা চুমুক লাগিয়ে বললো ফেলুদা “এক্ষেত্রে কাঠ বুড়ো কবিতাটার সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশনার তারিখ ১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারী-মার্চ নাগাদ | অর্থাৎ, কবিতাটা লেখা হয় তার থেকে আরো মাস কয়েক আগে | কিন্তু সে কথায় পরে আসছি - আপনি মার্শাল-রেসেস্ থিওরির নাম শুনেছেন?"

"সে আবার কি রকম রেস্, ফেলুবাবু?" লালমোহনবাবুর হাঁ-করা প্রশ্ন, "ঘোড়দৌড়, না মানুষের?"

"এ রেস্ সে রেস্ নয়, লালমোহনবাবু! এখানে রেসের মানে দৌড়-প্রতিযোগিতা নয় | এই রেস্ হলো গিয়ে জাতি |

"বুঝলুম", বললেন লালমোহনবাবু | "তবে মার্শাল বললেন - সামরিক জাতি আবার কি বস্তু?"

"ঠিক সামরিক নয়, লালমোহনবাবু | বাংলায় যোদ্ধৃজাতি বলে একটা খটোমটো শব্দ আছে, যেটা কিনা সরাসরি মার্শাল-রেসেস্ এরই প্রতিশব্দ | যুদ্ধনিপূণ, যুদ্ধকুশলী বা যুদ্ধপযুক্ত জঙ্গী জাতি বলতে পারেন |”

"অনেকটা তাহলে আমাদে রাজপুত বা নেপালি গোর্খাদের মতো |", বললেন লালমোহনবাবু |

"পারফেক্ট বলেছেন! আর মজার কথা হলো এই, যে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে আজও একটি গোর্খা রেজিমেন্ট আছে | এখনো ফী-বছর ব্রিটিশ আর্মি নেপালে গিয়ে এই রেজিমেন্টের জন্য রিক্রুটমেন্ট - মানে সৈনিক সংগ্রহ করে থাকে | গোর্খা যুবকদের কাছে এটি একটি অত্যন্ত লোভনীয় চাকরি | একবার সিলেক্ট হয়ে গেলে আর সারা জীবনের মতো ভাবনা নেই |"

"অন্তত যতক্ষণ না আবার যুদ্ধ শুরু হচ্ছে!", মন্তব্য করলেন লালমোহনবাবু | কথাটা নেহাত ভুল বলেন নি |

"মোদ্দা কথা, মার্শাল-রেসেস্ থিওরি - সামরিক তত্ত্ব হিসাবে যার বিকাশ ব্রিটিশ সেনাবাহিনী কিনা সিপাহী বিদ্রোহের কিছু পরে থেকেই ঘটাতে শুরু করে - তার আধার বা ভিত্তি ছিল এই বিশ্বাস, যে কিছু কিছু বিশেষ জাতির লোকেরা যুদ্ধ বা সামরিক পেশার জন্য বেশি মাত্রায় উপযুক্ত | কেবল শৌর্যবীর্য্য নয়, জাতির লোকেদের বিশ্বস্ততা, আনুগত্য ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যও ছিল মার্শাল-রেসেস্ থিওরির অঙ্গ |”

১৯১৪ সালের আগস্ট মাসে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ |", বলতে থাকলো ফেলুদা| "ব্রিটেনে এবং ব্রিটিশ শাসিত কলোনিগুলিতে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধের জন্য সৈনিক রিক্রুটমেন্ট | ভারতেও হয়েছিল | আর রিক্রুটমেন্টের ডাকে সাড়াও পড়েছিল ভালোই | ব্রিটিশ সরকার কিন্তু রিক্রুটমেন্টে মার্শাল রেসেস্ থিওরির প্রয়োগ করেছিলেন |"

"ও বাবা! সেই সেপাই মিউটিনির সময় থেকেই ব্রিটিশ সরকার মারকুটে জাতি-প্রজাতির হিসেব রাখছিলো নাকি?"

"তা একটা মোটামুটি ধারণা তাদের ছিল বই কি!", বললো ফেলুদা| "তবে ইতিমধ্যে ব্যাপারটা আরেকটু বৈজ্ঞানিক স্তরে রিসার্চ করার চেষ্টা করেন এক ব্রিটিশ আই সি এস অফিসার, যাঁর নাম ছিল হার্বার্ট রিসলি |

"হার্বার্ট -"

"হ্যাঁ, লালমোহমবাবু | পুরো নাম হার্বার্ট হোপ রিসলি | এবার কিন্তু এটা আপনার আসল হার্বার্ট | অর্থাৎ, হার্ভার্ড য়ুনিভার্সিটির হার্বার্ট নয় ", মুচকি হেসে বললো ফেলুদা |

"বুঝলুম!" অনেক দিন আগের ভুলটা মনে করিয়ে দেওয়াতে বিরস কণ্ঠে জবাব দিলেন লালমোহনবাবু |

"রিসলি-সাহেব তখনকার বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির নানা উপজাতিদের নিয়ে একটি মোটামুটি স্টাডি করেছিলেন | স্টাডির পদ্ধতিতে যদিও অনেক ভুলভ্রান্তি ছিল - যেটা আজ জানা যায় | তাছাড়া, হিন্দুধর্মের বামুন, কায়েত, বৈশ্য, শূদ্র, ইত্যাদি জাত ভেদাভেদও এই স্টাডির অঙ্গ হয়ে পরে |

বলেন কি! রিসলি-সাহেব হিন্দুধর্মের জাতিভেদও সামরিক পেশায় নিয়োজনের উপযুক্ততাকে ইনফ্লুয়েন্স করে বলে মনে করেছিলেন নাকি?” শুধোলেন লালমোহনবাবু |

তবে আর বলছি কী !", বললো ফেলুদা | “তার ওপর রিসলি আবার ১৯০১ সালের ভারতের আদমশুমারি বা লোকগণনার সেন্সাসেরও ভারপ্রাপ্ত ছিলেন | স্টাডির ফলাফলগুলি সম্প্রসারিত করে তিনি সমগ্র ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার লোকসম্প্রদায়ের একটা শ্রেণীবিভাজন করে ফেলেন |”

"লে হালুয়া!"

হালুয়া নয়, লালমোহনবাবু | বরং জগাখিচুড়ি বলতে পারেন | জাত ভেদাভেদের হিসেবটা রিসলি অন্য ধর্মের লোকেদের ওপর কি ভাবে চাপিয়েছেলেন তা ভগবানই জানেন! রিসলি মারা যান ১৯১১ সালে, কিন্তু ১৯১১র সেন্সাসেও রিসলির শ্রেণীবিভাজন সমানে চালু থাকে | আদমশুমারি হয়ে থাকে দশ বছরে একবার | তাই ১৯১৪র রিক্রুটমেন্টের সময়ে ১৯১১র সেন্সাস এর তালিকাই ব্যবহৃত হয় |"

"মারকুটে জাতি খুঁজতে তাহলে ব্রিটিশ সরকার ওই রিসলি-সাহেবের সেন্সাসেরই দ্বারস্থ হয়েছিল?" প্রশ্নটা অপ্রয়োজনীয় হলেও, করে ফেললেন লালমোহনবাবু |

"ঠিক তাই!", বললো ফেলুদা | "আপনি ইংল্যান্ডের হাল (Hull) য়ুনিভার্সিটির ডেভিড ওমিস্সী নামক ভদ্রলোকের ১৯৯৮এ লেখা 'দ্য সেপোয় এন্ড দ্য রাজ্ - দি ইন্ডিয়ান আর্মি, ১৮৬০-১৯৪০' বইটি পড়লে এর বিস্তারিত বিবরণ ও পাবেন |"

"থাক, তার আর দরকার নেই", বললেন লালমোহনবাবু | হাল উনিভার্সিটির ইংরিজি বই পড়তে গিয়ে হালে পানি পাবো না | অস্ট্রেলিয়া ঘুরতে গিয়েই যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে মশাই!"

এ ব্যাপারটা জানা ছিলো না | চট করে জিজ্ঞেস করে ফেললাম, "কেন, লালমোহনবাবু? কি হয়েছিল?"

"সে আর বোলো না তপেশ ভাই!" দুঃখ করলেন লালমোহনবাবু | "সবে সিডনী এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে পৌঁছেছি | টমাস কুকের বিধুবাবু বাস থেকে ট্যুরের সকলের লাগেজ নামানোর তদারকে একটু ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আমাকে ভিড়িয়ে দিয়েছিলেন হোটেলএর রেজিস্ট্রেশনে | রিসেপশনের লোক আমায় জিজ্ঞেস করলে: 'হাউ মেনি মাইলস?' কলকাতা থেকে সিডনী কত মাইল আমি থোড়াই জানি! ভেবে বললুম, 'টেন থাউজ্যান্ড' | সে অস্ট্রেলিয়ান আবার বলে, 'নো নো হাউ মেনি মাইলস?' বলো দিকি কী বিপদ! আবার বললুম, 'আই সেড তো, যে টেন থাউজ্যান্ড - মেবি মোর?' লোকটা তবুও বলে 'নো, নো, নো - ইন ইওর গ্রূপ - হাউ মেনি মাইলস এন্ড হাউ মেনি ফি-মাইলস, মাইট?' তখন বুঝতে পারি ব্যাটা হাউ মেনি মেলস এন্ড হাউ মেনি ফিমেলস শুধোচ্ছে! মাইট টা যে কি, তা আজও জানিনা |"

"মাইট টা মেট (mate), মানে ফ্রেন্ড, লালমোহনবাবু", বললো ফেলুদা | “দোষটা আপনার নয়, দোষটা অস্ট্রেলিয়ানদের উচ্চারণের |"

"ও হরি! আসলে হয়েছে কি, ইংরিজিতে চিরকালই কাঁচা ছিলুম কিনা, তাই সবই নিজের ভুল বলে মনে হয়! সে যাকগে - মার্শাল-রেসেস্ এর কথা বলছিলেন: বাঙালি জাতিকে ব্রিটিশ সরকার মার্শাল-রেসেস্ এর মধ্যে খুব একটা গণ্য করেনি বলে গন্ধ পাচ্ছি মনে হচ্ছে!", বললেন লালমোহনবাবু |

"ধরেছেন ঠিকই", ফেলুদা সম্মতি জানালো, "কিন্তু সেটা শুধু ওই জঙ্গী জাতির বিবেচনায় নয় | সেই সময়ের ব্রিটিশ সরকারের আভ্যন্তরীন মেমো - যা কিনা আজ পড়তে পাওয়া যায় - পড়লে জানতে পারবেন যে বাঙালিদের একটু অনিচ্ছুক সমীহ করে চলতো ব্রিটিশ সরকার | মেমোগুলি পড়লে জানা যায় যে বাঙালির রাজনৈতিক সচেতনতা আর স্বদেশচিন্তা সম্বন্ধে বৃটিশ সরকার থাকতো সর্বদাই উদ্বিগ্ন |"

"তাহলে সৈনিকসংগ্রহে বাঙালি বাদ দেবার অপচেষ্টা হয়েছিল বলছেন?"

"প্রকাশ্য ভাবে হয় নি, কিন্তু একটা প্রচ্ছন্ন অন্ত:প্রবাহ ছিল বই কি!" জানালো ফেলুদা, "তার ওপর রিসলির সেন্সাসের শ্রেণীবিভাজনের একটা অনিচ্ছাকৃত সামাজিক পরিণতিও ছিল | পি. পদ্মনাভ, যিনি কিনা ১৯৭১ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত স্বাধীন ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল ছিলেন, ১৯৭৮ সালে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন যাতে তিনি লেখেন, '... ১৯১১র সেন্সাসের সময়, বিশেষ করে বাংলায়, বেশির ভাগ লোকেরই ধারণা জন্মেছিল যে সেন্সাস এর উদেশ্য লোকগণনা নয়, বিভিন্ন জাতের তুলনামুলক মর্যাদাক্রম করা |"

"সেন্সাস ব্যাপারটার বেশ আনপপুলার হবার সম্ভাবনা ছিল তাহলে!" অনুধাবন করলেন লালমোহনবাবু |

হ্যাঁ, যথেষ্ট অপ্রিয় ছিল |" জানালো ফেলুদা, "বিশেষ করে ইন্টেলেকচুয়ালদের মধ্যে তো বটেই! আন্দাজ করতে পারছেন নিশ্চয়, আমি বলতে চাইছি যে এই সৈনিকসংগ্রহের ব্যাপারে মার্শাল-রেসেস্ থিওরির প্রয়োগ কাঠবুড়ো কবিতায় সুকুমার রায়ের শ্লেষ এর লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় |”

লালমোহনবাবু মাঝে মাঝেই হঠাৎ করে চমকে দিয়ে বেশ বুদ্ধিদীপ্ত তর্ক খাড়া করে বসেন | এবার করলেন | বললেন, "ফেলুবাবু, জিনিসগুলো সুকুমারবাবুর শ্লেষের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াতে পারে মানতে পারি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে লক্ষ্য হয়ে যে দাঁড়িয়েছিল, তার প্রমান কি? কাঠবুড়ো কবিতাটা নিতান্তই ছোটদের হাসানোর জন্যে লেখা ননসেন্স ভার্স | কবিতাতে শ্লেষ তো দূরের কথা, মার্শাল-রেসেস্ এর সঙ্গে কোনো কানেকশানের সম্ভাবনা তো ঘুনাক্ষরেও দেখতে পাচ্ছিনা !"

"পাচ্ছেন না?"

"নো স্যার! কাঠের আঁকজোক আর শ্রেণীবিভা- "

বিভা অবধি বলেই লালমোহনবাবু চোখ ছানাবড়া করে থমকে গেলেন | ব্যাপারটা বিভাবন করে ফেলেছেন বুঝতে পারলাম | উৎসাহে, উত্তেজনায় চোখমুখ বিভাসিত |

"কাঠগুলো বিভিন্ন রকমের জাত মিন করছে নাকি, ফেলুবাবু?!!!"

"সাবাশ, লালমোহনবাবু!" বাহবা জানালো ফেলুদা, "সুকুমার রায়ের চালাকি আপনি ধরে ফেলেছেন! জাতই mean করছে বটে! 'কোন্ কাঠ টিম্‌টিমে, কোন্‌টা বা জ্যান্ত' সম্বন্ধে কি অভিমত আপনার?"

"এ যে মেদামারা জাত আর মারকুটে জাতের কথা বলছে!"

"ভেরি গুড, লালমোহনবাবু!", বিশ্লেষণটার সরাসরি অনুমোদন জানিয়ে দিলো ফেলুদা | "আর 'কোন্ কাঠ পোষ মানে, কোন কাঠ শান্ত' লাইনটার মধ্যে বিশ্বস্ততা, আনুগত্য ইত্যাদি জাতিগত বৈশিষ্টেরও আভাস পাচ্ছেন আশাকরি?"

"আজ্ঞে হ্যাঁ! সেন্ট পার্সেন্ট পাচ্ছি!”

১৯১৪ সালে রিসলির ভ্রান্তিপূর্ণ শ্রেণীবিভাজনের ভিত্তিতে রিক্রুটমেন্ট, আর বাংলাকে রিক্রুটমেন্টের ব্যাপারে এড়িয়ে যাওয়ার কারণে সুকুমার রায় এই শ্লেষাত্মক কবিতাটি লেখেন |”, বোঝালো ফেলুদা, “ইতিহাসের হার্বার্ট হোপ রিসলি-ই হচ্ছেন আসলে কাঠ বুড়ো |”

"উরেশ্শা - ", বলে লাফিয়ে উঠেই জিভ কাটলেন লালমোহনবাবু | "কিছু মনে করবেন না - হেঁ হেঁ - সামলাতে পারিনি! আপনি কাঠ বুড়োর আসল নামটা পর্যন্ত বার করে ফেলেছেন!"

"ম্যাজিক মনে হলো নাতো লালমোহনবাবু?" মুচকি হেসে ফেলুদার প্রশ্ন, "লক্ষ্য করেছেন কি, কোন্ ফুটো খেতে ভালো, কোন্‌টা বা মন্দ / কোন্ কোন্ ফাটলের কি রকম গন্ধ' লাইনটাতে সুকুমার রায় বোঝাতে চেয়েছেন যে রিসলি সাহেব ধরেই নিয়েছিলেন যে বিভিন্ন জাতের শ্রেণীবিভাজন করে তিনি জঙ্গী জাতি আর অন্যান্য জাতি সব আইডেন্টিফাই করে ফেলেছেন? ম্যাজিক মনে হলে আমার কিন্তু কিছু বলার নেই | আমি কিন্তু আপনাকে আগাগোড়া সাক্ষ্য-প্রমান দিতে দিতেই এতদূর এনেছি!"

"সাক্ষ্য-প্রমানের জবাব নেই, ফেলুবাবু!" ঘোষণা করলেন লালমোহনবাবু | "কাঠের ব্যাপারটা দিব্বি বোঝা গেছে! তবে ওই আঁকজোকের ব্যাপারটা? মানে ওই 'আশে পাশে হিজি বিজি আঁকে কত অঙ্ক / ফাটা কাঠ ফুটো কাঠ হিসাব অসংখ্য', সেটা?

"সেটার ও মানে আছে, লালমোহনবাবু | রিসলির গবেষণার ভিত্তি ছিল ইংরেজিতে যাকে বলে এনথ্রোপোমেট্রিক মেজারমেন্ট - মানবদেহের নানান বৈশিষ্টের মাত্রাবিজ্ঞান বলতে পারেন, যেমন, বুকের ছাতি, হাড়ের মাপ, ইত্যাদি | 'হিজি বিজি আঁকে কত অঙ্ক' লাইনটা সেটাই বোঝায় |”

"কিন্তু মাপজোকে গলদ ছিল বলছিলেন?"

"ছিল", বললো ফেলুদা, "উনি নমুনা বা স্যাম্পল হিসাবে যতসংখক মাপজোক নিয়েছিলেন, পরিসংখ্যানবিজ্ঞান বা স্ট্যাটিসটিক্স এর হিসাবে সেটা ছিল খুবই অল্প | তা দিয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য নির্ণয়ে পৌঁছানো যায়না | ক্রিস্পিন বেটস নামে এক ভদ্রলোকের লেখা 'রেস্, কাস্ট এন্ড ট্রাইব ইন সেন্ট্রাল ইন্ডিয়া - দি আর্লি অরিজিন্স অফ ইন্ডিয়ান এনথ্রোপোমেট্রি' বইটিতে রিসলির এই ভুলের আলোচনা পাওয়া যায় | কাঠবুড়োকে দিয়ে 'আকাশেতে ঝুল ঝোলে, কাঠে তাই গর্ত' এই রকম অর্থহীন কথা বলিয়ে সুকুমার রায় রিসলির অ-বৈজ্ঞানিক ফলাফলের আকাশকুসুমের কথাই বোঝাতে চেয়েছেন |"

"উঃ কী প্রতিভা, মশাই! একবারটি ভাবুন দিকি! আকাশকুসুম বোঝাতে একেবারে আকাশে ঝুল ঝুলিয়ে দিয়েছেন!"

একটা ফাইনাল মজার ব্যাপার আছে কিন্তু, লালমোহনবাবু", বললো ফেলুদা, "কাঠবুড়ো কবিতার পাণ্ডুলিপি দেখলে জানা যায় যে অরিজিনাল খসড়া থেকে সুকুমার রায় গোটা কয়েক লাইন কেটে বাদ দিয়েছিলেন | তার মধ্যে অন্যতম হলো: 'কাঠেরে কাষ্ঠ কয়, এতো ভারী অন্যায়!' আনন্দ পাবলিশার্স এর সত্যজিৎ রায় এবং পার্থ বসু সম্পাদিত সুকুমার সাহিত্য সমগ্রের তৃতীয় খন্ডে এই তথ্যটি আছে | এটা তিনি কেন করেছিলেন সেটা আন্দাজ করতে পারেন কি?"

লালমোহনবাবু অনেক ভেবেও কুল-কিনারা করতে পারলেন না | হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, "হলো না, ফেলুবাবু! আপনিই বলে দিন | বেশি ভাবতে গেলে ইংরিজি বোঝার চাইতেও বেশি মাথা ঝিম ঝিম করে!"

"আসলে এই জাতিভেদের সঙ্গে রিসলির জঙ্গি জাতির ব্যাপার গুলিয়ে এক করে ফেলাটা সুকুমার রায় একেবারেই বরদাস্ত করতে পারেন নি |", বললো ফেলুদা | "প্রথম খসড়াতে সেটা বেশ পরিষ্কার করেই বুঝিয়েছিলেন তিনি | পরে, খুব সম্ভব, ওনার মনে হয় যে জিনিসটা হয়তো বুদ্ধিমান পাঠক-পাঠিকাদের কাছে নেহাতই সহজবোধ্য হয়ে যাবে, তাই ওই রদবদলটি তিনি করেন |"

"অভিপ্রায়টা কিন্তু এখনো ঠিক ক্লিয়ার হলো না, ফেলুবাবু!" অনুযোগ জানালেন লালমোহনবাবু!

"এ ব্যাপারটা কিন্তু লেখক হিসাবে আপনার ভালো লাগবে লালমোহনবাবু!" জানালো ফেলুদা | "রদবদলটি করে, সুকুমার রায় caste, বা জাত শব্দটা থেকে পাঠকদের নজর হঠানোর পরিকল্পনা করেছিলেন!”

কাস্ট?” লালমোহনবাবু মানতে অরাজি হলেন: "কবিতায় কাস্ট শব্দ ছিল কই, ফেলুবাবু?"

"চিনতে পারলেন না?" ফেলুদার চোখে মিটি মিটি হাসি | “আসলে কাঠের সাধুভাষা যে কাষ্ঠ | কাষ্ঠ আর caste এর উচ্চারণগত মিলটা লক্ষ্য করেছেন কি? Caste-এর ব্যাপারটা পাঠকদের জন্যে একেবারে জলবৎ তরলং করে দিতে সুকুমার রায় চান নি | কাষ্ঠ শব্দটি তাই বাদ পড়ে |"

"কী সব্বোনেশে বুদ্ধি, মশাই!", আবার চমৎকৃত হলেন লালমোহনবাবু, "গানের গুঁতোর বিশ্লেষণের সময় আপনি সুকুমার রায় সন্বন্ধে 'সাংঘাতিক' বিশেষণটা ব্যবহার করে একদম খাঁটি কথা বলেছেন, ফেলুবাবু!"

এ ব্যাপারে আমি অবশ্য এখন লালমোহনবাবুর সঙ্গে একমত |

লালমোহনবাবু খানিক্ষন চুপ করে থেকে আকাশের দিকে দু হাত তুলে একটি নমস্কার করলেন | "ধন্যি সুকুমার রায় আর ধন্যি আপনি, ফেলুবাবু! এসব কথা পাবলিক কে জানানো দরকার! আপনি আপনার বিশ্লেষণগুলি যে আপনার বন্ধুকে বই ছাপাবার জন্য দেবেন ঠিক করেছিলেন, তার কদ্দুর?"

"বই বেরিয়ে গেছে লালমোহনবাবু |", জানালো ফেলুদা, "আপাতত অনলাইন রিটেলার দের কাছ থেকে পাওয়াও যাচ্ছে | আবোল তাবোলের কবিতার ইংরেজি অনুবাদ আর অ্যান্যালিসিস একসঙ্গে করে প্রকাশ করা বই - কাটতি আপনার বই এর মতো না হলেও, শুনলাম ভালোই বিক্রি হচ্ছে | আপনি ঝটপট কিনে পড়ে ফেলুন | তা না হলে গল্প বলতে থাকলে এই তোপসে সব ছাপিয়ে ফেলবে | সব কবিতার মানে তোপসের গল্পে ফাঁস হয়ে গেলে বন্ধুর বই বিক্রি যদি কমে যায়, সে আমাকেই দুষবে তখন! আপনার অনুরোধ রাখতে গিয়ে কাঠবুড়োটা বলে ফেললাম! তবে ভালো খবর  - আপনার ইংরাজি পড়তে অনীহা হলে, এখন বইটির বাংলা অনুবাদও পাওয়া যাচ্ছে ! দেজ পাবলিশিং কর্তৃক প্রকাশিত সেই বইটির নাম 'আলোয় ঢাকা অন্ধকার' | লেখক এবং অনুবাদক নীলাদ্রি রায় আপনার আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ, কিন্তু এবার বড় বেলা হয়ে যাচ্ছে - আপনার শীতল বৈঠকখানা ত্যাগ করে বাইরের গরমের সঙ্গে যুদ্ধ করা ছাড়া আর গতি নেই! আজ আসি |

***

কাঠ বুড়োর ব্যাকস্টোরি শুনে লালমোহনবাবু যারপরনাই ইম্প্রেসেড | আমাকে বলেছিলেন যে ফেলুদার বন্ধু বই বার করে না থেকে থাকলে উনি নিজেই কাঠ বুড়োর বিশ্লেষণটা নিয়ে রিসলিকে সেন্ট্রাল-ক্যারেক্টার করে 'কাঠবুড়োর কাষ্ঠকাঠিন্য' নাম দিয়ে একটা ঐতিহাসিক উপন্যাসের কথা ভাবতেন |

আমার মতে, সেটা না হয়ে ভালোই হয়েছে | নামটা একটু "ইয়ে" হয়ে যাচ্ছিলো |

 ---------000--------

এই গল্পটিতে 'কাঠ বুড়ো' কবিতার যে অন্তর্নিহিত অর্থ দেওয়া হলো, সেটি এবং আবোল তাবোলের আরো অন্যান্য অনেক কবিতার অর্থগুলিও এই বইটিতে পাওয়া যাবে:  Rhymes of Whimsy – The Complete Abol Tabol. (ক্লিক করুন)| 

এই সেই বই, যেটা কিনা ফেলুদার ক্যালিফোর্নিয়া-প্রবাসী ছেলেবেলার বনধু প্রকাশ করেন|২৫৪ পৃষ্ঠার এই বইটি Amazon ও অন্যান্য অনলাইন রিটেলারের কাছ থেকে পাওয়া যায়: ভারতে দাম ৬০ টাকা; বিদেশে $১৯.৯৫ (পেপারব্যাক)| বইটির একটি  Facebook page (ক্লিক করুন) ও আছে, যেখানে আবোল তাবোলের কবিতা সম্পর্কে আরো তথ্য পাবেন| আছে বেশ কিছু অনুবাদ এবং কয়েকটি ভিডিও ও|